শেয়ারবাজারে ব্যাংক খাতের একচ্ছত্র প্রাধান্য, ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন আশা

নিজস্ব প্রতিবেদক   |   শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬ | 20 বার পঠিত | প্রিন্ট

শেয়ারবাজারে ব্যাংক খাতের একচ্ছত্র প্রাধান্য, ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন আশা
Responsive Ad Banner

নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বিদায়ী সপ্তাহে লেনদেনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য বিস্তার করেছে ব্যাংক খাত। অন্যান্য খাতের শেয়ারদরে মিশ্র প্রবণতা থাকলেও ব্যাংকের শেয়ার ঘিরে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ফলে সাপ্তাহিক মোট লেনদেনের প্রায় এক-চতুর্থাংশই হয়েছে ব্যাংক খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ারে। খাতটির লেনদেনে এমন বড় উল্লম্ফন শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ও খাতভিত্তিক বিনিয়োগের প্রবণতায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বাজার বিশ্লেষকরা।

ডিএসইর সাপ্তাহিক বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদায়ী সপ্তাহে (২৫ থেকে ২৯ অক্টোবর) ব্যাংক খাতের কোম্পানিগুলোর শেয়ার লেনদেনের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ১৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা। যা ডিএসইর মোট সাপ্তাহিক লেনদেনের ২২ দশমিক ৫৬ শতাংশ।

Responsive Ad Banner

এর আগের সপ্তাহে ব্যাংক খাতে লেনদেন হয়েছিল ৫৬৬ কোটি ৬ লাখ টাকা। সেই হিসাবে এক সপ্তাহের ব্যবধানে খাতটির লেনদেন বেড়েছে ৪৪৮ কোটি ৭ লাখ টাকা। বৃদ্ধির হার প্রায় ৭৯ দশমিক ১৬ শতাংশ।

লেনদেনের এই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে ব্যাংক খাত ডিএসইর অন্যান্য সব খাতকে পেছনে ফেলেছে। বিশেষ করে শেয়ারবাজারে চলমান অস্থিরতা ও বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের মধ্যেও ব্যাংকের শেয়ারে বিপুল পরিমাণ লেনদেন বাজার সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

ব্যাংক খাতের প্রতি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ার কারণ

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাংক খাতের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের আকস্মিক আগ্রহ বৃদ্ধির পেছনে একাধিক বিষয় কাজ করে থাকতে পারে। বছরের এই সময়ে ব্যাংকগুলোর আর্থিক কার্যক্রম ও মুনাফার সম্ভাবনা নিয়ে বিনিয়োগকারীদের প্রত্যাশা অন্যতম কারণ হতে পারে।

পাশাপাশি ব্যাংকগুলোর সম্ভাব্য লভ্যাংশ ঘোষণা নিয়ে বাজারে আলোচনা ও গুঞ্জন বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া তুলনামূলক নিরাপদ বিনিয়োগের ক্ষেত্র হিসেবে ব্যাংকের শেয়ারকে বিবেচনা করার প্রবণতাও খাতটির লেনদেন বৃদ্ধির একটি কারণ হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের ধারণা, অন্যান্য খাতের তুলনায় ব্যাংকের অনেক শেয়ারের বাজারদর এবং মূল্য-আয় অনুপাত বা পিই রেশিও অপেক্ষাকৃত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। ফলে বিনিয়োগের ঝুঁকি কিছুটা কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ ব্যাংক খাতের দিকে ঝুঁকেছেন।

তাদের মতে, শেয়ারবাজারে যখন বিভিন্ন খাতের দর ওঠানামা করছে এবং বিনিয়োগকারীরা নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সতর্ক অবস্থান নিচ্ছেন, তখন ব্যাংক খাতের শেয়ারে লেনদেন বৃদ্ধি বাজারে বিনিয়োগের প্রবাহ কোন দিকে যাচ্ছে, সে বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দিচ্ছে।

৩৬ ব্যাংকের মধ্যে দর বেড়েছে ১৫টির

ডিএসইর সাপ্তাহিক খাতভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিদায়ী সপ্তাহে ব্যাংক খাতের মোট ৩৬টি কোম্পানির শেয়ার লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি ব্যাংকের শেয়ারদর বেড়েছে। বিপরীতে ১৩টি ব্যাংকের শেয়ারদর কমেছে এবং বাকি ৮টি কোম্পানির শেয়ারদর অপরিবর্তিত রয়েছে।

অর্থাৎ, খাতটিতে দরবৃদ্ধি পাওয়া কোম্পানির সংখ্যা দরপতনের তালিকায় থাকা কোম্পানির তুলনায় কিছুটা বেশি ছিল। ফলে শেয়ারদরের উত্থান-পতনের হিসাবেও ব্যাংক খাতে তুলনামূলক ইতিবাচক প্রবণতা লক্ষ্য করা গেছে।

তবে ব্যাংক খাতের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক ছিল লেনদেনের পরিমাণ। শেয়ারদরে মিশ্র প্রবণতা থাকলেও লেনদেনের ক্ষেত্রে অন্য সব খাতের তুলনায় অনেক এগিয়ে ছিল ব্যাংক।

বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এই চিত্র থেকে বোঝা যায়, ব্যাংক খাতের শেয়ার কেনাবেচায় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বিশেষ করে এক সপ্তাহের ব্যবধানে প্রায় ৮০ শতাংশ লেনদেন বৃদ্ধি খাতটির প্রতি বাজারের বাড়তি মনোযোগের বিষয়টি সামনে এনেছে।

আস্থার সংকটের বাজারে ব্যাংক খাতের শক্ত অবস্থান

সাম্প্রতিক সময়ে দেশের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার ঘাটতি, তারল্য সংকট এবং ধারাবাহিক দরপতন নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যাংক খাতের লেনদেনে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি বাজারের জন্য কিছুটা ইতিবাচক বার্তা বহন করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তাদের মতে, শেয়ারবাজারের সামগ্রিক পরিস্থিতি নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগকারীদের সক্রিয়তা বাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বিনিয়োগের আগ্রহ ধরে রাখতে সহায়তা করছে।

বিশেষ করে অন্য খাতগুলোর লেনদেনে যখন ওঠানামা দেখা যাচ্ছে, তখন ব্যাংক খাতের এই শক্তিশালী অবস্থান বাজারে বিনিয়োগকারীদের মনোবল কিছুটা হলেও ধরে রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।

তবে শুধু একটি খাতের লেনদেন বৃদ্ধি পুরো শেয়ারবাজারে স্থায়ী স্থিতিশীলতা ফিরে আসার নিশ্চয়তা দেয় না। ব্যাংক খাতের এই ইতিবাচক প্রবণতা কতটা দীর্ঘস্থায়ী হয় এবং অন্যান্য খাতেও বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বাড়ে কি না, তার ওপর বাজারের পরবর্তী গতিপ্রকৃতি অনেকাংশে নির্ভর করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শেয়ারবাজারে নতুন নেতৃত্বের ইঙ্গিত?

বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বিদায়ী সপ্তাহে ব্যাংক খাতের শেয়ার কেনাবেচায় যে ব্যাপক সক্রিয়তা দেখা গেছে, তা শেয়ারবাজারের খাতভিত্তিক বিনিয়োগ প্রবণতায় সম্ভাব্য পরিবর্তনের বিষয়টিকে সামনে এনেছে।

এতদিন বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ছড়িয়ে থাকলেও আলোচ্য সপ্তাহে ব্যাংক খাত এককভাবে লেনদেনের শীর্ষস্থান দখল করেছে। ফলে বাজারে নতুন করে ব্যাংক খাতের নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিশেষ করে মোট লেনদেনের ২২ দশমিক ৫৬ শতাংশ একটি খাতে কেন্দ্রীভূত হওয়া এবং মাত্র এক সপ্তাহে সেই খাতের লেনদেন প্রায় ৭৯ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার বিষয়টি বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ব্যাংক খাতের এই লেনদেনের গতি আগামী সপ্তাহগুলোতেও অব্যাহত থাকলে তা শেয়ারবাজারের সামগ্রিক লেনদেনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অন্যদিকে, অন্যান্য খাতের শেয়ারেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ফিরে এলে বাজারে আরও ভারসাম্যপূর্ণ পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তবে ব্যাংকের শেয়ারে সাম্প্রতিক লেনদেন বৃদ্ধির প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদি হবে, নাকি সাময়িক বিনিয়োগ প্রবাহের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

বিদায়ী সপ্তাহে ব্যাংক খাতের শেয়ারে বিপুল লেনদেন বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন প্রত্যাশা তৈরি করলেও এর ধারাবাহিকতা নিয়ে হিসাব-নিকাশ চলছে। ব্যাংক খাতের এই আধিপত্য আগামী দিনগুলোতে বজায় থাকে, নাকি অন্য খাতগুলো ঘুরে দাঁড়িয়ে লেনদেনে নতুন নেতৃত্ব দেয়, সেদিকেই এখন নজর বাজার সংশ্লিষ্ট ও বিনিয়োগকারীদের।

একই সঙ্গে ব্যাংক খাতের এই উত্থান শেয়ারবাজারকে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার পথে এগিয়ে নিতে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে, সেটিও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহের অন্যতম বিষয় হয়ে উঠেছে।

Facebook Comments Box

Posted ৯:২৪ পিএম | শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬

sharebazar24 |

মো. সাজিদ খান প্রধান সম্পাদক
মো. সিরাজুল ইসলাম সম্পাদক
বার্তা ও সম্পাদকীয় কার্যালয়

৬০/১, পুরানা পল্টন, ঢাকা-১০০০

হেল্প লাইনঃ 01742-768172

E-mail: sharebazar024@gmail.com